আজ সোমবার, ১১ই শ্রাবণ ১৪২৮, ২৬শে জুলাই ২০২১

দূর্লভ ও বিপন্ন পাখি কালো কাস্তেচরার খোঁজে

রবিউল হাসান : ২৬ মার্চ ২০২১ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর, দিনটা দেশের সব নাগরিকের জন্য একটি বিশেষ দিন। এই দিনটি আমার জন্য আরও একটা কারনে বিশেষ দিন। এই বিশেষ দিনে বেরিয়ে পড়েছিলাম কালো কাস্তেচরার খোঁজে। আগের দিন বার্ড ক্লাবের সদস্য মুহাম্মদ তারিক হাসান জানিয়েছিলেন পদ্মার চরে কালো কাস্তেচরা দেখা যাচ্ছে, যাবেন নাকি। তার কথা শুনে পাখিটি দেখার লোভ সামলাতে না পেরে রাজি হয়ে গেলাম।

সেদিন সকাল ৮টায় দুইজন রওয়ানা দিলাম একটা বাইকে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আলিমনগর ঘাটে পৌঁছালাম পৌনে নটার দিকে। সকাল ৯টায় আমরা নৌকায় চড়ে রওয়ানা হলাম কাঙ্খিত পাখি দেখা ও ছবি তোলার জন্য। শ্যালো ইঞ্জিন চালিত নৌকায় প্রায় দেড় ঘন্টার যাত্রা শেষে নামলাম খলিফার চরে। তারপর অনেকটা হাঁটা পথ। বেশ কিছুটা ধূ ধূ বালির উপর পথ চলা, মাঝে মধ্যে শুকনো কাশের জমি। এদিক ওদিক ধান ক্ষেত, পটলের ক্ষেতসহ অন্যান্য ফসলের মাঠ। ধান ক্ষেতে সেচের জন্য চলছে পানির পাম্প, পাম্পের এক ঘেঁয়ে আওয়াজ। বেশ কিছুটা দূরে খলিফার চর গ্রাম।

এইসব ফসলের ক্ষেতের মাঝামাঝি জায়গাটা কিছুটা উঁচু, পাশে প্রায় শুকিয়ে যাওয়া নদীর একটা ধারা। এই বিশাল এলাকাটা ফাঁকা। খানিকটা দুরে মূল পদ্মা নদী। চরে তেমন বড় গাছ-পালা নাই। সূর্যের তীব্র তাপ, আমরা আশ্রয় নিলাম ছোট একটা গাছের নিচে। খুব কাছেই কিছু ঈগল ও চিল উড়ছে। কখনও বিভিন্ন গাছে বসছে। চারিদিক থেকে বিভিন্ন পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। অপেক্ষার পালা শুরু, ঘন্টা খানেক অপেক্ষার পর আমি তারিককে বলে পদ্মার তীরে গেলাম পাখির ছবি তুলতে। ঘন্টা দেড়েক নদী তীর ও চরে কিছু পাখির ছবি তোলার পর আবার সেই গাছের নিচে আশ্রয় নিলাম।

অপেক্ষা, কালো কাস্তেচরা কখন আসে। দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকাল হতে যাচ্ছে, দুইজন এইদিক সেদিক দেখছি। সাড়ে তিনটার দিকে তারিকের চিৎকার ‘ভাই একটা কালো কাস্তেচরা পাখি এসেছে, তাড়াতাড়ি চলেন। ঝটপট দাঁড়িয়ে পড়লাম, তাকিয়ে দেখি অনেক দূরে সেই কাঙ্খিত পাখি। কোন দিকে গেলে পাখির ভালো ছবি পাওয়া যাবে তা আলোচনা করে আমরা ক্যামেরা হাতে অত্যন্ত সতর্ক হয়ে এগিয়ে গেলাম। মাত্র এক ঘন্টা সময় আমাদের হাতে। এই সময়ের মধ্যেই আমাদের ছবি তুলতে হবে। ফিরে যাবার একটাই নৌকা, সাড়ে ৪ টায় নৌকা অন্য ঘাট থেকে ছেড়ে আসবে। যাত্রী তোলার জন্য কয়েক মিনিট এই ঘাটে দাঁড়াবে। এই নৌকা ছেড়ে চলে গেলে ফিরে যাবার কোন নৌকা নাই।

এসব আশংকা নিয়েই পাখিটির দিকে এগিয়ে গেলাম, ধানক্ষেতের সরু আলের উপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে একটা নিরাপদ দুরত্ব থেকে ছবি তোলা শুরু করলাম। শেষ পর্যন্ত কিছু ছবি তোলা সম্ভব হলো। ছবি তোলা শেষ করে অন্য পাখির ছবি তুলতে তুলতে ফিরে আসলাম ঘাটে, ৫টায় নৌকা ছাড়লো।কাছ থেকে দূর্লভ পাখিটিকে দেখা এবং ছবি তোলার পর সব কষ্ট ভূলে গেলাম, আনন্দে মনটা ভরে গিয়েছিল।

কালো কাস্তেচরা ছাড়াও আমাদের দেশে কালামাথা কাস্তেচরা ও খয়রা কাস্তেচরা দেখা যায়।Threskiornithidae পরিবারের কালো কাস্তেচরা বা কালো দোচরা পাখির ইংরেজি নাম Red-naped ibis, Indian black ibis বা Black ibis, এর বৈজ্ঞানিক নাম: Pseudibis papillosa. কালো কাস্তেচরার গড় দৈর্ঘ্য ৬০-৬৮ সেন্টিমিটার। স্ত্রী-পুরুষ পাখি দেখতে একই রকম। পালকবিহীন মাথার উপরের অংশ লাল। গলা ও কাঁধ গাঢ় খয়েরী। ডানা ও লেজ নীল-সবুজের সঙ্গে কালোর মিশ্রণ, ডানার উপরের দিকে কিছুটা সাদা। ঠোঁট নিচের দিকে কাস্তের মতো বাঁকানো। লম্বা পা লালচে গোলাপি। এরা জলজ উদ্ভিদ, তৃণভূমি ও ফসলি জমিতে একাকী, জোড়ায় বা ছোট দলে ঘুরে বেড়ায় এবং পোকা, কেঁচো, বিভিন্ন সরীসৃপ, ব্যাঙ খায়। মার্চ-অক্টোবর প্রজননের মৌসুম। বাসা তৈরি করে উঁচু গাছে। ডিম পাড়ে ২ থেকে ৪টা । ডিম থেকে বাচ্চা ফুটতে সময় লাগে ৩৩ দিন ( সূত্র উইকিপিডিয়া)।

বাংলাদেশে শুধুমাত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পঞ্চগড়ে এই পাখি দেখা যায়। আমাদের দেশ ছাড়াও ভারত ও দক্ষিন এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাখিটিকে দেখা যায়। পাখি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশের পাখির ফিল্ডগাইড বইয়ের সহ লেখক তারেক অনু জানান, ২০১৫ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মার চরে আমি প্রথম তিনটি কালো কাস্তেচরা দেখি। তিনি আরো বলেন, পাখিটি এখন বাংলাদেশে খুব দূর্লভ ও বিপন্ন। এটি আমাদের দেশে শুধুমাত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পঞ্চগড়ে মাঝে মধ্যে দেখা যায়।

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনসারভেশন অফ নেচার-আইইউসিএন পাখিটিকে "লেস্ট কনসার্ন" হিসাবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। এছাড়া এই পাখি সহ সকল বন্য পাখি বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন-২০১২ অনুযায়ী সংরক্ষিত। এদের ধরা, শিকার করা, খাঁচায় পোষা বা বিক্রয় করা দণ্ডনীয় অপরাধ।

লেখক : গণমাধ্যম কর্মী

মন্তব্য সমুহ
০ টি মন্তব্য
মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন
এই শ্রেনির আরো সংবাদ

ফিচার নিউজ