আজ রবিবার, ১৭ই আশ্বিন ১৪২৯, ২রা অক্টোবর ২০২২

ভিনদেশে বিজয় উৎসব - এ কে এম তাজকির উজ জামান

মেহেদি হাসান

পাহাড়ের গা ঘেষে আমাদের গাড়ী ছুটে যাচ্ছে। দূরের পাহাড় কাছে এসে সরে যাচ্ছে আবার দূরে। কখন কোল ঘেঁষে, কখনো বা পাশ দিয়ে। সবুজ পাহাড়ের পাশে, গাঢ় সবুজ, একটু দূরের নীল, তারওপরে হালকা নীল হয়ে আকাশের সাথে মিশে যাওয়া পাহাড় আর শেষ হয় না। এক অদ্ভুত মোহবিষ্ট ছুটে চলা। ধ্যানমগ্ন ঋষির মত নীরব আর নিশ্চুপ চারপাশ, কিন্তু অনুভবের সমস্ত দরজা খোলা। গন্তব্য বেশ দূর। আমার ইউনিভার্সিটির ডরমিটরি থেকে প্রায় দেড়শ কিমি দূরের একটা স্কুল। যাচ্ছি তয়োকো সিটির তয়োকো কম্প্রিহেন্সিভ হাই স্কুলের বাচ্চাদের বাংলাদেশের গল্প শোনাতে। 

জাপানে আসার পরেই জাইকার সাথে কাজ করে, এমন একটা সংগঠন যাবার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। ১৬ ডিসেম্বর, ২০২১। আমার প্রিয় মাতৃভূমির ৫০ বছর পূর্ণ হবার দিন। যে দেশটা কে পেতে প্রাণ দিয়েছে লক্ষ মানুষ, গড়ে তুলতে প্রতিদিন কাজ করে যাচ্ছে কোটি প্রাণ। বিদেশ-বিভূইয়ে সে দেশ সম্পর্কে আমাকে বলতে হবে। কি বলি আর কি, না বলি। আমার প্রতিটি কর্মস্থলে জাতীয় পতাকার নিচে লিখে রাখতাম – Love it or Leave it। বসার পেছনে দেয়ালে থাকত এটা। আমার নিজের প্রেরণার জায়গা ছিল এই জায়গাটা। তাই কি বলব ওদের? প্রেজন্টেশনে কি বলি তাদের? কেন উন্নত বিশ্বের একটা শিক্ষার্থী আমাদের এখানে আসবে? আমরা নিজেরাই যখন বেগমপাড়া বানাতে ব্যস্ত। কিছু মানুষের কাজ, তার আলোচনা-সমালোচনাই তো বাংলাদেশ না। অজস্র মেধাবী, পরিশ্রমী, ভাল মননের মানুষের গল্প তো থাকে আলোচনারই বাইরে। কি জানাই তাদের?

দেশে থাকলে এই দিনটা কাটে চরম ব্যস্ততায়। সারাদিন ব্যাপী অনুষ্ঠানের পাশাপাশি, বেশ আগে থেকেই থাকে প্রস্তুতির ব্যস্ততা। অনেক কাজ আর পরিশ্রমের ফল কি হয় তা জানি না। সকাল থেকে শুরু হয় কে কার আগে ফুল দিবে। আগে ফুল দিতেই হবে। ৫০ বছরে আমাদের প্রধান শিক্ষা এই- অন্যকে নয় নিজেকে বড় ভাব। সামনে চেয়ারে বসতেই হবে তা যতই ঠাসাঠাসি করে বসি না কেন- আর এই চেয়ার রাখা যে কি দায়? আগের ১০/১২ দিনের টানা পরিশ্রমের পরে এই খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে ক্লান্তি যেন যেতেই চায় না। সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায় যখন স্টেডিয়ামে জাতীয় সংগীতের সাথে নীল আকাশে উড়তে থাকে লাল-সবুজের পতাকা। এবার ভেবেছিলাম ঘুম দিব একটা। কিন্তু যেতে হবে বহুদূর। ডরম থেকে হেটে তাকারাজুকা স্টেশন। ট্রেনে নিশিনোমিয়া কিতাগুচি তে পৌঁছে ট্রেন চেঞ্জ করে কোবে সাননোমিয়াতে যাওয়া। সেখান থেকে ট্যাক্সিতে প্রায় আড়াই ঘণ্টার জার্নি করে তবে, তয়োকা তে পৌছানো। কান্ট্রি সাইডে, সে যে দেশেই হোক না কে তার একটা আলাদা আবেদন আছে। যাবার পথে ১০ মিনিটের যাত্রা বিরতিতে থেমেছিলাম মিনামিএছিযেন শহরের রেস্টহাউজ এ। এই শহরে ডাইনোসরের একটা মিউজিয়াম আছে। কালো বিন এর জন্য বিখ্যাত শহরটি। অনেক আগে এখানে ডাইনোসরের ফসিল পাওয়া গেছে। বলে রাখা ভাল জাপানে বিন এর ব্যবহার অনেক। বিশেষ করে রেড বিনের দেখা মিলবে হরহামেশা যে কোন খাবারেই।

পাহাড়ের নেশা চেপে বসে আছে সেই ফেলুদা পড়ার পর থেকেই। পাহাড় এর উঁচু, বিস্তৃত, সৌম্য আর শান্ত রুপ আমার কাছে সবসময়ই নতুন আর অভিনব। দারুন এক রহস্য আর রোমাঞ্চ প্রতি পদে পদে। জাপানে পাহাড়ে হাত দেয়া হয় না। প্রায় সব পাহাড়ই “ভার্জিন ফরেষ্ট”। উপরন্ত স্থানীয় জনসাধারণ নিয়ে আছে পাহাড় দেখাশোনার জন্য কমিটি। এরা পাহাড়কে ভালবাসে। পাহাড়ের মাঝের ফাকা জায়গায় গড়ে উঠেছে বসতি। চাষবাসের জন্য ক্ষেত। এরই মাঝে কোন কোন জায়গায় দেখা মিলছে নদীর। পাহাড়ের পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদী মিলিয়ে ও যাচ্ছে পাহাড়েরই বাঁকে। গাড়ির গতির কাছে হার মেনে যাচ্ছে দু’পাশের পাহাড়গুলো। মিলিয়ে যাচ্ছে স্বপ্নদৃশ্যের মতোই, কিন্তু শেষ হচ্ছে না। গাড়ির সামনে থেকে দেখলে দূরের পাহাড়গুলো ক্রমান্বয়ে এগিয়ে আসছিল। দিগন্তে নীল আকাশ ছুঁয়ে জানিয়ে দিচ্ছিল পথ শেষ এখানেই। বিজয়ের হাসিতে নয়, স্নিগ্ধ সবুজ সৌন্দর্যে-নিশ্চুপ নির্মোহে। কিন্তু যেখানে পথের শেষ মনে হচ্ছিল, সেখানেই জাপানের পরিশ্রমী মানুষের জয়গান। মেধা আর পরিশ্রম দিয়ে বানিয়েছে অসংখ্য টানেল। প্রথমে গোনা শুরু করেছিলাম, পরে খেই হারিয়ে ফেললাম। আড়াই ঘণ্টার জার্নিতে নিনেদ পক্ষে ১৫ টার উপরে টানেল পার হলাম। নিরবিচ্ছিন্ন এই ছুটে চলার পথ ছিল মসৃণ। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি কি তা এই সামান্য পথই প্রমাণ করে। কত বছর আগের এই সব কাজ এখনও সমান ভাবে কার্যকরী। চারপাশের পাহাড় আর নদী-ক্ষেত পেরিয়ে পৌছালাম তয়োকা হাই স্কুলে। জাপানে সবসময়ই আমার মনে হয় এদেশে সবই আছে, খালি মানুষ নাই। স্কুলে সুনসান নীরবতা। স্কুলের প্রিন্সিপাল ইয়ামামোতো সেনসি তাঁর শিক্ষকবৃন্দ কে নিয়ে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। আজ ভাল দিনে আমরা নাকি এসেছি-কাল এখানে তুষারপাতের সম্ভাবনা। আসলেই আজ অন্যরকম দিন। ১৬ ডিসেম্বর, ২০২১। আমার দেশের ৫০ তম জন্মদিন। শুভ জন্মদিন প্রিয় মাতৃভূমি- প্রিয় স্বদেশ। 

পুনশচঃ আপাতত লেখা থামাই। প্রেজেন্টেশনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করি অন্যদিন। দূর্বল লেখকের বড় সমস্যা-অল্প কথায় লেখা শেষ হয় না। একটা বিষয় শেয়ার করতেই হয়- এই স্কুলের ছেলে মেয়েরা নানা দেশে ঘুরতে যায়। এরা এর আগে কখনই বাংলাদেশের নাম শুনেছিলনা। ফিরে আসার সময় জানিয়েছে তাদের অনেকেই আমার দেশে আসতে চায়। নদীর পানিতে পা ডুবিয়ে হাত দিয়ে মেখে ফিসকারী খেতে চায়। পতাকার রঙে রাঙিয়ে সবুজ এই দেশটা দেখতে চায়। আসুন নিজের জন্য, অনাগত ভবিষ্যতের জন্য, সারা বিশ্বের জন্য বাংলাদেশকে তৈরী করি। বিদেশীরা এসে লিখুক লাল-সবুজের বন্দনা। মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে; কি জাদু করিয়া বন্দে মায়া লাগাইছে------ ভালোবাসি বাংলাদেশ।

লেখকঃ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের উপসচিব।  বর্তমানে জাপানের সুনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক। 

মন্তব্য সমুহ
০ টি মন্তব্য
মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন
এই শ্রেনির আরো সংবাদ

ফিচার নিউজ